Monday, January 5, 2009

সেদিন তুষার ঝরেছিল

সেদিন তুষার ঝরেছিল
(স্মৃতিচারণ)
ইমতিয়ার শামীম


শহীদুল জহিরের মৃত্যুর পরপরই কোনও কিছু লেখার বেলায় আমার ব্যক্তিগত সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই হলো, তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি পরিচয় ছিল না। দশকওয়ারি সাহিত্যবিভাজনে বিশ্বাসী সম্পাদক ও আলোচকরা যাদের গায়ে আশির দশকের ছাপ লাগিয়েছিলেন, শহীদুল জহিরসহ আমাদের অনেকের গায়েই সেই ছাপ এতদিনে সুস্পষ্টভাবে বসে গেছে অনেকটা জন্মদাগের মতো। আক্ষরিক জন্মের কথা ধরলে তিনি আমার একযুগ আগে পৃথিবীতে এসেছেন। তবু এখন সম্পাদক ও আলোচকদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি,–তাঁরা আমাদের একই সময়ের বৃত্তে আবদ্ধ করেছেন জন্যে। আশির দশকের উল্লেখযোগ্য সব লেখকের সঙ্গেই ধীরে ধীরে আমার পরিচয় হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু শহীদুল জহির। তাঁকে আমি মুখোমুখি দেখি নি। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় নি।

কালাকালের অর্থে এই দেখা হওয়া না-হওয়া অবশ্য কোনও বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষ যখন বেদনার্ত হয় তখন মহাকালের কথা ভাবে না। মৃত্যুগন্ধী সময়ের আবেগই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। এ জন্যেই হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটির কথা বলতে গিয়ে হয়তো ব্যক্তিটির সঙ্গে স্মৃতিচারকের স্মৃতিগুলিই বড় হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না তা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটিকে অবলম্বন করে নিজেকেই বড় করে তোলার মতো না হয় ততক্ষণ তা দৃষ্টিকটূও নয়। সত্যিকার অর্থে মানুষটির প্রতি ব্যক্তিগত মুগ্ধতা ছাড়া এইসব সময়ে অন্য কোনও বয়ান খুব বেশি প্রীতিকর মনে হয় না। অথচ তেমন কোনও সঞ্চয়ই নেই আমার, যা দিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত হতে পারি।

তারপরও কোনও না কোনওভাবে তিনি আমার ব্যক্তিগত আত্মার সঙ্গী। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর পাঠক এবং আমরা একই সময়ের মানুষ। কারণ যে জনপদ আর মানুষগুলো তাঁর জনপ্রিয় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে বেড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে বেশ ক’টি ছোটগল্পে, কাকতালীয়ভাবে হলেও তাঁর মতো আমিও সেই জনপদের মানুষ। তাঁর মতো আমারও পিতার ভিটে সিরাজগঞ্জ জেলাতে। তাঁর রায়গঞ্জ আমার চেনা জায়গা, চেনা ওই গোপন রাজনীতির ক্ষত ও ক্ষতি। ‘ক্ষত যত ক্ষতি তত’ এই সত্যেরই তো মুখোমুখি করেন তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে। আমরা আমাদের শৈশব কৈশোরের দিনগুলোয় জনপদের সেই ক্ষত ও ক্ষতিকে দেখেছি রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে, অশ্রুপাতের মধ্যে দিয়ে। এমনকি যখন আমরা প্রায়উন্মূল হয়েছি সিরাজগঞ্জ থেকে এবং বিশেষত সিরাজগঞ্জ শহরবাসী কারও টেলিফোন পেলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি কারও মৃত্যু অথবা দুর্ঘটনার খবর পেতে, এই ক্ষত ও ক্ষতি তখন আরও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়েছে। যেমন, এক সকালে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে আমি জানতে পারি ফিরোজ মাস্টার খুন হয়েছেন। ফিরোজ মাস্টার ছিলেন সিরাজগঞ্জ জনপদে গোপন রাজনীতির এক কিংবদন্তি। গোপন রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে তিনি তখন একটি ডানপন্থী দলে যোগ দিয়ে নির্জন জীবনযাপনের পথ বেঁছে নিয়েছেন। প্রতিদিন রাতে খাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হন এবং হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি কালভার্টের ওপর গিয়ে কিছুক্ষণ একা একা বসে থাকেন। এক রাতে তিনি হাঁটতে বেরিয়ে আর ফিরে আসেন না। তাঁকে উদ্ধার করা হয় নিহত অবস্থায়।

আরও একদিন গভীর রাতে খবর এলো, ভয়ানক এক গাড়িদুর্ঘটনা ঘটেছে বগুড়া মহাসড়কে। নিহত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও একদা গণবাহিনীর সংগঠক মির্জা আবদুল আজিজ ও ম. মামুন। গুরুতর আহত আরেকজন গণবাহিনীর সংগঠক ও জাসদ নেতা আবদুল হাই। ম. মামুন ছিলেন গোপন রাজনীতির কালে ফিরোজ মাস্টারের প্রিয় অনুসারী। যৌবনে কামারখন্দে দিনেদুপুরে এক পুলিশ অফিসার হত্যার দায়ে ম. মামুন অভিযুক্ত হয়েছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যুক্ত হন স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাতে।

দূর থেকে এরকম যত মৃত্যুর খবর পেয়েছি কিংবদন্তিময় একটি সময়ের একেক সংগঠকের ততবারই কেন জানি মনে পড়েছে সে রাতে পূর্ণিমা ছিলর কথা। বললে হয়তো বিশ্বাস হবে না–কিন্তু ওই জনপদের অধিবাসী আমরা জানি, রায়গঞ্জ-কামারখন্দ-জামতৈল জনপদের কোনও কোনও এলাকার চেয়ারম্যান হওয়ার মানে জেনেশুনে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। অথচ সেই মৃত্যুর মোহে প্রতিবারই কেউ না কেউ নির্বাচন করে, চেয়ারম্যান হয় এবং কোনও এক রাতে অথবা দিনে খুন হয়ে যায়।

এও এক জাদুবাস্তবতাই বটে!

দুই.
ক্ষত ও ক্ষতি নিয়ে এইভাবে আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে প্রায়উন্মূল হয়েছি, প্রায় সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছি সিরাজগঞ্জের সঙ্গে, পৃথিবীমুখী হয়েছি তারপর আমাদের প্রিয় মার্কেজের বুয়েন্দিয়ার মতো। মাকের্জের উপন্যাস শত বছরের নির্জনতায় গভীর এক ক্রান্তিকালীন সময় আছে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সেখানে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আবারও দূর অভিযানে বের হওয়ার। কিন্তু তার স্ত্রী উরসুলা কিছুতেই রাজি হয় না বসতি ত্যাগ করতে। বুয়েন্দিয়া তাকে বলে, দূরঅভিযানে যেতে তার কোনও অসুবিধাই নেই, কেননা ‘এখনও এখানে আমাদের কেউ মারা যায় নি। মরে মাটির তলায় আত্মীয় কেউ না শোয়া পর্যন্ত কোনও জায়গায় কারও অধিকার বা প্রেম জন্মায় না।’ সে কথা শুনে তার বউ উরসুলা শান্ত কঠিন কণ্ঠে বলে, ‘তা হলে আমি এখানেই মরব, যাতে তোমরা সবাই এখানেই থাকো।’ মানুষের মাটি, স্বদেশ ও বসতি গড়ে ওঠে এরকম সব বুয়েন্দিয়ার আত্মার শোক দিয়ে, এরকম সব উরসুলার হৃদয়ের শোক দিয়ে। শহীদুল জহিরের গ্রামের বাড়ি ছিল রায়গঞ্জে, কিন্তু তিনি জন্ম নিয়েছিলেন পুরানো ঢাকায়। নিজের এক বসতি তিনি স্থাপন করতে চেয়েছেন তাঁর সব গল্পউপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। সেইখানে কখনও তরমুজের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, ডালপুরিভাসা তেল টগবগিয়ে ফোটে, ইঁদুর ও বিড়াল খেলা করে, আবদুল করিম বারবার কাচের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখে, পাতকুয়ায় সুবোধ চন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না বারবার পড়ে যায়। কখনও আবার তিনি যেন বা জেনেশুনেই সংখ্যালঘু হয়ে যান, বিচ্ছিন্নতার বদলে ডুবে যান সংখ্যালঘুতার বিপন্নতায়। বিবিধ অঞ্চল ও আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি অবলম্বন করেছেন বিভিন্ন গল্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের উপস্থাপনস্বর।

আমাদের সেই জনপদের একঘেয়ে মুথা ও মেঠো সমতল, খরখরে গ্রীষ্মের দাবদাহ সঞ্চয় করে রাখা প্রায়উৎপাটিত নিঃসঙ্গ বটগাছ, আঁকাবাঁকা মেঠোরাস্তা, অথবা বর্ষায় ডুবে যাওয়া রুপালি আকাশ, কর্দমাক্ত রাস্তা এবং একজন চেয়ারম্যান খুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুন হওয়ার জন্যে প্রস্তুত আরও সব হবু চেয়ারম্যান, এসব কিছুই শহীদুল জহির একে একে কব্জা করে নিয়েছিলেন। তাঁর মতো আর কেউ জানে নি, এইসব জনপদ ও মানুষের গল্প সত্যিই গল্প মনে হয়। আমাদের গ্রামগুলোর মানুষের গল্প, জীবন, হতাশা, সংগ্রাম আর যৌনতাও এত বিচিত্র যে এই আমিও যখন তা এমনকি সিরাজগঞ্জেরই কাউকে শুনাই, শুনতে শুনতে তারা বলে, এইসব আজগুবি গল্প কোনখানে পাই’ছো? সলপের গল্প, না? ভেবে দেখুন, ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত একজন মানুষ দণ্ডিত হওয়ার পর্যায় এড়াতে গ্রামের সালিশে অজ্ঞান হয়ে গেল। কিছুতেই তার সংজ্ঞা আর ফিরিয়ে আনাই যাচ্ছে না। দাঁতের মধ্যে চামচ ঢুকিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে তাকে পানি খাওয়ানোর। কিন্তু সে পণ করেছে কিছুতেই কিছু খাবে না। হঠাৎ একজন কী মনে করে একগ্লাস দুধ এনে ঠোঁটের ওপর রাখতেই অজ্ঞান মানুষটা গরুর দুধের ঘ্রাণ পেয়ে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার যাবতীয় আশঙ্কা ভুলে ঢক ঢক করে তা গিলে ফেলল। আবার এই মানুষটিই যখন প্রবীণ আর স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত, একদিন হঠাৎ তার পাড়াপড়শিদের সম্পর্কে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই যে ট্রেনে চড়ল, নিজের এলাকার নাম মনে না থাকায় সে আর পারল না নিজের বাড়িতেও ফিরে আসতে। গ্রামের মানুষদের কাছে সে বেঁচে রইল নিরুদ্দেশ এক গ্রামবাসী হিসেবে। কেউ আবার বুড়ো হয়ে গেল প্রচণ্ড বর্ষার সময় বোয়াল মাছের গ্রাসে অণ্ডকোষ হারানোর স্মৃতি নিয়ে। আবার যুদ্ধ যখন চলছে, তখন এমন একজন মানুষকে পাওয়া গেল, যে মৃত, অর্ধমৃত সব খানসেনা আর রাজাকারদের লিঙ্গ কেটে একটি টুকরিতে জমা করত। জালিম খানসেনা আর তার দোসরদের জন্মক্ষমতাই সে নষ্ট করে দেবে, এই তার একমাত্র আকাক্সক্ষা।

এরকম এক জনপদ যেখানে আছে সেখানে শুধুমাত্র জাদুবাস্তবতা দিয়ে শহীদুল জহিরকে বিচার করতে যাওয়া এক অর্থে তার প্রতি অবিচার করা। আমি অবশ্য তাঁর পাঠক হই অনেক পরে। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে। মারুফ রায়হানের আগ্রহে মাটি পত্রিকার গল্পসংখ্যায় শহীদুল জহির লেখেন ‘আমাদের কুটিরশিল্প’, আমি লিখি ‘বালকের বামহাত’। ততদিনে তিনি জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা লিখে সুপরিচিত। কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল গল্পপাঠক হওয়ার মাধ্যমে। তাঁর লেখার শক্তিমত্তা নিয়ে আমার কোনও সংশয় ছিল না, এখনও নেই; কিন্তু তাকে ‘জাদুবাস্তবতা’র ঘেরটোপে বন্দি করতে আমি বরাবরই দ্বিধান্বিত হয়েছি। অনেক পরে বাংলাপিডিয়াতে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য পাই তাঁর সম্পর্কে, সেটিকেই বরং অনেক ঠিক মনে হয়। তাঁর লেখার অন্যতর একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সেখানটাতে, বলা হয়েছে শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিলতে প্রকাশ পেয়েছে বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম।

এর মধ্যে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ বছর পার হয়েছে গত বছর। আমাদের বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে যে রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি হয় এবং ক্রমাগত যা ধর্মাশ্রয়ী বিশ্বরাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিকৃত গণতন্ত্রচর্চার ধারা গড়ে তোলে, কবিতায় এই পরিস্থিতির একটি মনোজগত ও সংঘবদ্ধ ছায়া পড়ে শামসুর রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বইটিতে। কয়েক বছরের মধ্যেই সৈয়দ শামসুল হক লেখেন স্মৃতিমেধ নামের উপন্যাস, যাতে স্বাধীনতার দশ বছর পর শহীদ এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জিনাত এক রাজাকারকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে সবাইকে অস্থির করে তোলে। বিস্মিত, আহত ও ক্রুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা দেবর মুখোমুখি হয় তার ভাবি জিনাতের। আর জিনাত নিজেই নিজেকে অপমানিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জাগিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেন এই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে, তোরা রাজাকারকে মন্ত্রী বানাতে পারিস, আমি পারি না স্বামী বানাতে? এই উপন্যাস পত্রিকায় ছাপা হওয়ারও বছরপাঁচেক পর ১৯৮৭-তে আমাদের হাতে আসে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। যাকে অনেকেই প্রথমে প্রবন্ধের বই মনে করে হাতে নেন, তারপর ‘ও’ বলে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। এ বইটি থেকেই মূলত শহীদুল জহিরকে জাদুবাস্তবতার লেখক হিসেবে অভিহিত করা হতে থাকে। যদিও দর্শন হিসেবে জাদুবাস্তবতার চেয়ে অস্তিত্ববাদই এতে অনেক বেশি প্রকাশিত হয়েছে।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনী লতিয়ে ওঠে ১৯৮৫ সালে, ঢাকার লক্ষীবাজার লেনে। এ কাহিনী প্রকৃতার্থে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পথপরিক্রমার কাহিনী, যে রাজনীতি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর লুপ্ত হয়েছিল, ১৯৭৫-এর পর আবার ফিরে এসেছে মহাসমারোহে। যুদ্ধাপরাধী, যে প্রত্যয়টি ব্যবহারে ইদানিং আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, এক অর্থে তা অনেক বেশি নিরীহ। কেননা এই প্রত্যয়টি কেবল যুদ্ধের অপরাধকেই উচ্চকিত করে, ধর্মীয় রাজনীতির নিষ্ঠুরতা এ প্রত্যয়ে ঢাকা পড়ে যায়। অথচ একাত্তরের স্মৃতি, যন্ত্রণা ও অভিজ্ঞান থেকে আমাদের কাছে ধর্মীয় রাজনীতি যুদ্ধাপরাধের সমার্থক। রাজাকার, আলবদর বা আলশামস প্রত্যয়গুলির প্রয়োগ বরং তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক ইতিহাসচেতনাজাত। যাই হোক, এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তারপরও মনে পড়ল, কারণ শহীদুল জহিরের এ উপন্যাসে বদু মওলানা খানসেনাদের দোসর, যে একাত্তরে মানুষকে চাপাতি দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে তার বাড়ির ছাদ থেকে জনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই বদু মওলানারই ছেলে আবুল খায়ের তার পিতার চেতনাসমেত মহাসমারোহে ফিরে আসে লক্ষীবাজার লেনে। সে আবিষ্কার করে মেয়ের নাম মোমেনা রাখার মধ্যে দিয়ে এই মহল্লার এক অর্বাচীন প্রকারান্তরে তার প্রতি, তার আদর্শের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। কেননা একাত্তরে ওই অর্বাচীনের বোন মোমেনাকেই তো তারা ধর্ষণ করেছিল। তার মানে একাত্তরকে এ বান্দা ভুলে যায় নি। আবদুল মজিদ,–সে আবুল খায়েরকে ভাষণ দিতে দেখে এবং দ্বিধান্বিত হয় এবং দ্বিধার এই জগত ক্রমশ বাড়তে থাকে। তার এই দ্বিধাকে আরও স্থায়ী করে এলাকাবাসী,–যারা বদু মওলানার ভয়ে ভীত–নিজেদের বাড়ি থেকে উৎপাটিত হওয়ার ও নির্যাতিত হওয়ার কিংবা আবারও চাপাতির কোপে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার ভয়ে যাদের পক্ষে সম্ভব নয় আর জেগে ওঠা। সৈয়দ হকের স্মৃতিমেধ-এর সঙ্গে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনীর একটি শ্রেণিরূপ তফাৎ সুস্পষ্ট। স্মৃতিমেধ-এ পুরুষেরা, মধ্যবিত্ত পুরুষেরা, তাদের ওপর, তাদের নারীদের ওপর খানসেনা ও তাদের দোসরদের ধর্ষণ-নির্যাতন ভুলে গিয়ে একই শ্রেণীতে লীন হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত নারীটিকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে হচ্ছে নিজের ইতিহাসগত অস্তিত্ব। আর শহীদুল জহিরের উপন্যাসে নিম্নধ্যবিত্ত পুরুষ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে তার আত্মার নিগড়ে বাধা এক নারীর স্মৃতিকে ঘিরে নতুন এক নারীর উদ্বোধনের মাধ্যমে।

শহীদুল জহিরের দ্বিতীয় উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিলও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ের গল্প। অবক্ষয়িত সময়, গুপ্ত সব হত্যাকাণ্ড এসব এখানে শান্ত সমাহিত পূর্ণিমা রাতের নিচে। গোপন রাজনীতিতে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে বুর্জোয়া ও সাম্যবাদী উভয় রাজনৈতিক শক্তিরই ধর্মীয় রাজনীতির কাছে পরাস্ত হওয়ার আখ্যান তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে এতে। সপরিবারে একটি হিন্দুপরিবারকে হত্যা করার অভিজ্ঞতাকে মূলসূত্র ধরে শহীদুল জহির এ ঘটনাকে নিজের সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে উন্নীত করেন এমন এক অভিজ্ঞানে, যার ফলে খুব সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন এটি আসলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার রূপক উপাখ্যান। বন্যার স্রোতের মতো বাক্যের পর বাক্য বেরিয়ে আসে এ উপন্যাসে, প্রায়ই আমাদের মনে থাকে না কে এ সব বাক্যের কথক, লেখক নিজে নাকি কোনও চরিত্র, নাকি কোনও প্রতিচরিত্র। চাঁদের অমাবস্যা বিভ্রমও রয়েছে একইসঙ্গে। শহীদুল জহিরের আলোচকরা বিশেষত এ উপন্যাসটিকেই জাদুবাস্তবতার প্রামাণ্য বই হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।

আমার মনে হয়, জাদুবাস্তবতার যোগ যতটুকুই থাক না কেন, শহীদুল জহিরের সাহিত্য আলোচনার জন্যে এ প্রত্যয়টি যথেষ্ট নয়। ২০০৫-এ বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তবতাসংক্রান্ত এক লেখায়ও প্রসঙ্গক্রমে আমি লিখেছিলাম, “এইসব ছাপ ছাড়াও শহীদুল জহির টিকে থাকতে পারেন, তাঁর কথাসাহিত্যের একটি উপসংহার তৈরি করতে পারেন।” এ ছাড়াও লিখেছিলাম, ‘‘যে জন্যে তাঁর লেখার প্রতি আমাদের মনযোগ ও মোহাচ্ছন্নতা তৈরি হয় তা হলো লোকজ উপাদান, ভূগোলের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ এবং একই প্রসঙ্গে ঘুরপাক খাওয়ার মতো গ্রামীণ (গ্রাম্য নয়) ভাষাভঙ্গি। বিশেষত এই ভাষাভঙ্গির কারণে নগরের কাহিনীতে প্রবেশ করার পরও শহীদুল জহির পাঠকের কাছে স্বস্তিকর মনে হয়, কেননা আমরা আসলে নিজেদের মধ্যে পরিক্রমণ করতেই ভালবাসি এবং এই ভাষাভঙ্গি পুনরাবৃত্তির মধ্যে দিয়ে অপার এক দুলুনি তৈরি করে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ইতিহাসবোধের প্রতি উপেক্ষা অথবা অমনোযোগ শহীদুল জহিরের লেখা ও অনুভূতির বিস্তৃতিকে সীমিত করে ফেলতে পারে, যা আমরা বিশেষ করে তাঁর সব উপন্যাসেই লক্ষ্য করি। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে আমরা একটি জাতির জাদুবাস্তবতাময় ক্রান্তিকাল খুঁজে পাই বটে, কিন্তু তা কি আমাদের মধ্যে সেই জাতির হাজার বছরের মিশে যাওয়া ইতিহাসবোধের ক্ষরণ ঘটাতে পারে? না কি আমরা হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থেমে গিয়ে সীমিত এক পরিসরেই আনন্দিত হতে থাকি?’’ তাঁর মুগ্ধ পাঠকদের দলে থেকেও এ রকম একটি মন্তব্য করায় তিনি কী মনে করেছিলেন, সেটি আমার আর কোনওদিনই জানা হবে না।

তিন.
মৃত্যুগন্ধী এই সময়ে পুরানো ওই অনুভূতিটুকু আবারও উল্লেখ করছি শুধু এ কারণেই যে অপরিচয়ের বদলে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাই যৌক্তিক ছিল আমার চিন্তাগুলোকে আরও পরিণত করতে। যদি আমার তাঁর সঙ্গে পরিচয় হতো, যদি আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলতাম, তা হলে নিশ্চয়ই তাঁর লেখার এরকম সব দিকই হতো তাঁর ও আমার আলোচনার বিষয়। এখন তাঁর সঙ্গে আর কারোরই দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও কবি সমুদ্র গুপ্তের সঙ্গে যতবার দেখা হবে ততবারই আরও বেশি করে আমার মনে হবে তাঁর কথা এবং হয়তো আনমনে চেষ্টা করব একই বংশোদ্ভূত দুজনের চেহারার মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উদ্ঘাটনের।

এমন হয়েছে, কয়েকবারই আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আমাদের বন্ধু গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা ফয়জুল ইসলামের কারণে। আমি আগ্রহী হয়েছি সেই মানুষটিকে দেখতে, যার বিছানা বরাবর একটি টিভি এমনভাবে প্রতিস্থাপন করা যাতে মানুষটি শুয়ে থেকেও আরাম করে রিমোট ঘুরিয়ে টিভি দেখতে পারে। তাঁর সম্পর্কে ওপরের স্পর্শকাতর বিভিন্ন সব বাক্য লেখার ও ছাপানোর পর আমি তাঁকে আমার তখনকার সর্বশেষ বইটি (মাৎস্যন্যায়ের বাকপ্রতিমা) পাঠাই পাঠ করতে। এবং কয়েকদিন পরে উত্তেজিত কিংবা নিরুত্তেজিত ফয়জুল ইসলাম আমাকে বলে, ‘স্যার তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।’ এই বলাবলি বেশ কয়েকবার ঘটে, আবদুল করিমের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখার মতো। কখনও আমি হাসি, ‘যেতে তো হবেই, আপনি ওনাকে স্যার বলেন, আর আমি তাকে ভাই বলব। আপনি কীভাবে স্যার বলেন সেটা তো আমাকে দেখতে হবে।’ কখনও ফয়জুল আমাকে শোনায়, শহীদুল জহির কার কার লেখার প্রশংসা করেছেন। শুনতে শুনতে বলি, ‘বড় লেখকরা সব সময়েই প্রশংসা করেন। এমনকি খারাপ লেখকদের লেখায়ও মহৎ উপাদান খুঁজে পান। উত্তেজিত হবেন না, ধৈর্য হারাবেন না।’ আসলে যদি আমাদের যাওয়া হতো তা হলে কী নিয়ে কথা বলতাম আমরা? এই জাদুবাস্তবতার ঘোর? অথবা অস্তিত্ববাদ? অথবা বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম? অথবা এসব কিছুই নয়! আমরা কথা বলতাম দুর্ধর্ষ নকশালী ইসমাইলকে নিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা যে সবসময় মাথায় বেধে রাখত মাথায় যুদ্ধকালে আর স্বাধীন সিরাজগঞ্জ শহরে প্রথম প্রবেশ করেছিল যার বাহিনী। অথচ পরে যে পুরো বাহিনীই খুন হয়ে গেল নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে! হয়তো কথা বলতাম ফিরোজ মাস্টারকে নিয়ে, গণবাহিনী নিয়ে, গোপন রাজনীতি নিয়ে, ধর্মজ রাজনীতির হিংস্র কদর্য মানুষগুলিকে হত্যা না করে কেন গোপন রাজনীতির মানুষগুলো কেবল নিজেদের মধ্যেই হানাহানি করেছে সেসব নিয়ে। আর মুক্তিযুদ্ধ,–সে কথাও নিশ্চয়ই উঠত। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দুর্বলতার কথা কে না জানে! আর এই জন্যে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পোস্টিং দিলে তিনি বিব্রতও হয়েছিলেন ভীষণরকম।

প্রবাদ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত, নিজেকে শহীদুল জহির সরিয়ে রেখেছিলেন আর সব লেখক থেকে অনেক দূরে। কিন্তু মানুষ থেকেও কি? যাকে তাঁর একাকীত্ব ও নির্জনতা বলছি তাকে কি আমরা ব্যাখ্যা করব শুধু লেখকদের আড্ডায় তাঁর অনুপস্থিতির তত্ত্ব দিয়ে? রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করতে করতে তিনি কি শুনতেন না মানুষের কথা? এই যে এত মানুষ, এত চরিত্র, এত অঞ্চলভাষা তা তিনি পেলেন কোথা থেকে? বেশ কয়েক বছর আগে কথা পত্রিকায় কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের নেয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। উত্তর দেয়ার ভাষাভঙ্গি থেকে মনে হয়েছিল, মানুষ থেকে তিনি যত নির্জনে ছিলেন বলে শোনা যায় তত নির্জনে ছিলেন না সম্ভবত। মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন এবং এই দূরত্বই তাঁকে এ ছাপ এঁটে দিয়েছে। কেননা লেখক হিসেবে মিডিয়ার প্রতি অনেকের যে দাসত্ব রয়েছে, শহীদুল জহিরের দাসত্বহীনতা সে ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়, অনুকরণীয়। দাসত্বের গ্লানি ঢাকার জন্যে তাঁকে তাই ঠেলে দেয়া হয়েছে নির্জনতার প্রকোষ্ঠে।

শহীদুল জহিরের কাছে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না, কেননা মোটা দাগে বলতে গেলে ফয়জুল ইসলামের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ কমে এসেছিল। কেন, সেটা খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে দূরত্বও অনেক দূরত্ব কমিয়ে আনে। ফয়জুলই আমাকে তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানালেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। আমি সেই মৃত্যুর দৃশ্যকল্পের অনেকটাই অনুমান করতে পারলাম, কেননা আমি নিজেও দীর্ঘকাল একা থাকতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম, একজন মানুষ ভর দুপুরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। মুগ্ধ পাঠকদের কেউ কাছে নেই, পদাধিকার বলে অনেক ক্ষমতা থাকলেও সেই সময় ‘জ্বি স্যার’ বলার মতো কেউই তাঁর কাছে নেই। তিনি অনেক কষ্টে সিড়ি ভেঙে ভেঙে নামতে নামতে একসময় নোংরা সিঁড়িতেই বসে পড়লেন। দুপুরের উজ্জ্বল আলো পৃথিবীর সবখানে। ইস্কাটনের ওইসব সরকারি বাসাগুলো দেখার ভাগ্য আমাদের অনেকেরই আছে। তিনি তাঁর অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা করছেন চারপাশের উজ্জ্বল আলোর কাছে। চেষ্টা করছেন বসন্তের বাতাস টেনে নিতে অবাধ্য বুকের ভেতর। অপেক্ষা করছেন নিজস্ব এক জাদুবাস্তবতার। টেলিফোন করছেন বোনের ছেলের কাছে। কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের কানে রিংটোন খুব সহজে পৌঁছায় না, তা সে যত আপনই হোক না কেন। কেউ তার কোনও কাজে আসে নি, কেবল তাকে মানুষ ভেবে হঠাৎ করেই তাকে দেখে ছুটে এসেছে ‘সামান্য’ এক কাজের মানুষ। সে তাকে রিকশায় করে হলি ফ্যামিলিতে পৌঁছে দিয়েছে। তারপর ডাক্তারদের প্রসঙ্গ না হয় থাক। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর অনেক নিঃসঙ্গতা ও মহীয়ানতার সন্ধান পেয়েছি, তিনি তাই নিয়ে বেঁচে থাকুন এই পৃথিবীতে।

চার.
ইংল্যান্ডে তুষার পড়লেও লন্ডনে তুষারপাত বিরল এক ঘটনা। গত গুড ফ্রাইডে’তে হঠাৎ করেই ঘোষণা আসে, আগামীকাল থেকে তুষার পড়তে পারে। ওই রাতে আমি অনেকদিন পর সিগারেট কিনি আসন্ন হিমের আশঙ্কায়। শনিবার সকালে দেখি, সত্যিই এই মার্চের মধ্যে, যখন সামার খুব কাছে চলে এসেছে, ঝির ঝির করে তুষার পড়ছে আকাশ থেকে। পরদিন রবিবার, সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে আর তখনও আমি শুয়ে, স্ত্রী বাইরে থেকে টেলিফোন করে আমাকে আবারও তুষারপাতের খবর জানায়। আমি ওঠার পর জানালা খুলে মুখে একটু বরফ মেখে অভ্যাসবশত ই-মেইল চেক করতে বসি এবং ইনবক্সের প্রথমেই চোখ আটকে যায় ফয়জুল ইসলামের চিঠিটিতে : ‘শহীদুল জহির হ্যাজ ডায়েজ টুডে: লাইফ ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান ডেথ।’ আমার চ্যাটিংবক্সে লালবৃত্ত জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ সেই লাল বৃত্ত পেরিয়ে একই মেসেজ দেয়। আমি এইসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াই।

দেখি সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করে আমার প্রিয় বাংলাদেশের কার্পাস তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা শাদা শাদা নৃত্যরতা তুষার ঝরে পড়ছে, গলে পড়ছে জানালার কাচে, রাস্তার ওপরে, লাইটপোস্টের গায়ে, ওক আর চেরিনাস্ট গাছের গায়ে। মনে হচ্ছে, যে প্রকৃতি এতদিন নীরবে তার সঙ্গী ছিল সেই প্রকৃতি আজ ভেঙে পড়ছে শহীদুল জহিরের শোকে। এই কদিন আগেই এক প্রিয় মানুষকে আমি লিখেছিলাম, মানুষকে বা হাতের উল্টো পিঠে কান্না মুছে হাসি আনতে হয়। আজ আমিও সেই চেষ্টা করি, কাঁপা কাঁপা হাতে তুষারের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে সিগারেট জ্বালানোর চেষ্টা করি, মনে মনে বলি, যিশু চলে গেছেন, যিশু তুষারে ঢেকে যাচ্ছেন।

http://arts.bdnews24.com/?p=1282#more-1282
১০ চৈত্র ১৪১৪/ ২৪ মার্চ ২০০৮

পাণিনি ও অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ (একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা)

পাণিনি ও অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ (একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা)
লেখক: RAMUDA

মা সরস্বতীর সঙ্গে আমার ছোটবেলা থেকে যে কেস চলছে, সেটা চলছে তো চলছেই। তবে ৬০ বছর পর, সম্প্রতি আমার উকিলবাবু আমায় একটা খবর দিয়েছেন। তাতে আমি সান্তনা পেয়েছি। মা আমার কেসটা হেরে গিয়েছেন।
তাই টুকলী কোরে পাণিনি সম্বন্ধে লিখছি। কাদের কাছ থেকে টুকলী কোরেছি, সেটা শেষে লিখব। সংস্কৃত শিখে নাকি পাণিনি পড়তে হয়। তা, সংস্কৃত আমি শিখিনি। তাই সাহস করে এবারে আসল বিষয়ে আসি।
আমরা কোলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলে গেলে, পাণিনির একটি আবক্ষ মূর্ত্তি দেখতে পাব।
তা এই পাণিনি ভদ্রলোকটি কে? কি বা তাঁর পরিচয়? আমাদের এই পোড়া দেশটার একটা দুর্ভাগ্য আছে। গ্রীকদের হেরোডেটাস ছিল, কিন্তু কলহন ছাড়া কেউ আর আমাদের প্রাচীন ইতিহাস লেখেন নি বা লিখলেও তা আর নানা কারণে পাওয়া যায় না। তাই কলহনের আগে জানতে হলে, আমাদের বিভিন্ন বিদেশী পর্য্যটকদের লেখা বিবরণ, জনশ্রুতি, উপকথার ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই সবের ওপর ভিত্তি করে, বলা যায় যে, পাণিনি খ্রীষ্টপূর্ব্ব ৯ম থেকে খ্রীষ্টপূর্ব্ব ৪র্থ শতাব্দীর মধ্যে কোন এক সময় জীবিত ছিলেন। তবে গবেষকরা একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, পাণিনির জীবনকাল খ্রীষ্টপূর্ব্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষে বা খ্রীষ্টপূর্ব্ব ৭ম শতাব্দীর প্রথম দিকে ছিল। পাণিনির জন্মস্থান নিয়েও একই রকম বিভ্রান্তি থাকলেও গবেষকরা মোটামুটি ভাবে একমত যে তিনি, গান্ধার প্রদেশের (বর্তমান- পশ্চিম পাকিস্তান) শালাতুর (বর্তমান- লাহোর) গ্রামে জন্মেছিলেন।
পাণিনির জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে মগধের রাজধানী পাটলীপুত্রে। তাই কিছু পণ্ডিতের মতে পাণিনির পূর্বপুরুষেরা শালাতুর গ্রামের হলেও পাণিনির জন্ম হয়েছিল, পাটলীপুত্রে।
পাণিনি ছিলেন একজন শিষ্ট। শিষ্টেরা ছিলেন এক ধরণের ব্রাহ্মণ। শাস্ত্রের ওপর ছিল তাঁদের অসামান্য অধিকার।
পার্থিব সুখ, স্বাচ্ছন্দকে বিসর্জন দিয়ে তাঁরা একটি বিশেষ অঞ্চলে বসবাস করতেন(গবেষণা? ) । বসবাসের স্থানের উত্তরে ছিল হিমালয়, দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্বতমালা, পূর্বে বঙ্গভূমি এবং পশ্চিমে আরাবল্লী পাহাড়ের রেখা।
পাণিনি ছিলেন, পণি নামে এক ঋষির সন্তান। এবার পণি বা পাণিন্‌ একটি গোত্র নাম। সংস্কৃত সাহিত্যে পণি নামে একটি গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়।
পণি, ফিনিকিয়, পিউনিক এবং ফিনিসীয় গোষ্ঠীর লোকেরা একসময় ভারত মহাসাগরের উপকূলে বসবাস করতেন।
পাণিনির বাবা ছিলেন ফিনিকিয় পণি গোষ্ঠীর মানুষ। তাঁর নাম ছিল, শলঙ্ক। তাই পাণিনির আর এক নাম ছিল শালাঙ্কি। পাণিনির মা ছিলেন ডেসিয়ান। দক্ষ জাতির মহিলা। তাই তাঁর নাম দাক্ষি। তিনি রূপে গুণে অতুলনীয়া ছিলেন। পাণিনির আর এক নাম তাই দাক্ষিপুত্র। পাণিনির ভক্ত পতঞ্জলি পাণিনি কে এই নামে বিখ্যাত করেছেন।
পাণিনি ছিলেন অহিগলমালা শিবের উপাসক। সেইজন্য তাঁকে আহিক বলা হয়েছে।
অতএব, পাণিনির পুরো নাম হলো:-
আহিক দাক্ষিপুত্র শালাঙ্কি শালাতুরীয় পাণিন্‌ পাণিনি।
এই নামের মধ্যে পাণিনির ইষ্ট,মাতা,পিতা, জন্মস্থান, গোত্র সবকিছুর পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।
এবার আসা যাক, তাঁর ব্যাকরণ সম্বন্ধে। পাণিনির আগে কি ব্যাকরণ ছিল না? ছিল। বেদের যে ষড়ঙ্গ অর্থাৎ ৬ টি অঙ্গ (শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, নিরুক্ত ও জ্যোতিষ) তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাকরণ।
বেদ মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে হলে, ভাষাতত্ত্ব, (Linguistics), উচ্চারণ বিধি বা (Phonetics ) এবং ব্যাকরণ শাস্ত্র এই তিনটি বিষয় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পাণিনির আগে মোট ৮ টি ব্যাকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলি হলো:- ঐন্দ্রং, চান্দ্রং, কাশকৃৎস্নং, কৌমারং, সারস্বতং আপিশলং, শাকলং এবং শাকটায়নং। এর মধ্যে শাকটায়নং ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ।
পাণিনি এইসব ব্যাকরণ ভালভাবেই পড়েছিলেন এবং এইসব ব্যাকরণ থেকে অনেক কিছু নিয়েছেন। তিনি এইসব ব্যাকরণের ভুল ধারণা গুলিকে বাদ দিয়েছেন এবং শেষ পর্য্যন্ত সবাইকে অতিক্রম করে গেছেন।
পাণিনি তাঁর ব্যাকরণে বৈদিক ভাষা (ছান্দস) এবং আঞ্চলিক ভাষা ( লৌকিক) এই ২টি ভাষাকে গ্রহণ করেছেন। এই ব্যাপারটি পৃথিবীর কোন ব্যাকরণে আগেও ঘটেনি এবং পরেও না।
এখানে বলে রাখা ভাল, রামায়ণে যখন সুগ্রীব ছদ্মবেশে হনুমানকে পাঠিয়েছিলেন রামচন্দ্রের পরিচয় জানতে, তখন হনুমানের কথা শুনে, রামচন্দ্র লক্ষণকে বলছেন যে হনুমান পরিশীলিত ও ব্যাকরণ সম্মত কথা বলছেন। রামচন্দ্র এও বলছেন যে হনুমান ব্যাকরণ বেশ ভালভাবে আয়ত্ত করেছেন।
সুতরাং প্রাচীন যুগে যে ব্যাকরণের চর্চা ছিল, এব্যাপারে কোন বিতর্ক উঠতে পারে না।
এখন অনিবার্য ভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পাণিনি কি এমন করেছিলেন? এবার আসা যাক সেই প্রসঙ্গে।
পাশ্চাত্যের প্রাচীন ভাষা হল, প্রধানত গ্রীক ও ল্যাটিন। ভারতবর্ষের প্রাচীন ভাষা হল সংস্কৃত। আমাদের ভারত দেশে, প্রধান ভাষা হল ১৫ টি। এই ১৫ টি প্রধান ভাষার উৎপত্তি কিন্তু সংস্কৃত।
সংস্কৃত সাহিত্যের যে ভাণ্ডার, তা অকল্পনীয়। এই সংস্কৃত সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ হলো ঋগ্বেদ।
বেদোত্তোর যুগে পাণিনি তাঁর সমসাময়িক বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন।
বলা হয় পাণিনি হিমালয়ে গিয়ে ১৮ দিন ধরে শিবের তপস্যা করে শিবকে সন্তুষ্ট করেন। নৃত্যের ভঙ্গীতে শিব ১৪ বার ঢক্কা বা ঢাক বাজান।প্রতিবার ঢাক বাজানোর সাথে এক একটি নতুন শব্দের সৃস্টি হলো। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে, নটরাজ মূর্ত্তি শিবের আর একটি প্রতিরূপ। নটরাজ মূর্ত্তি পৃথিবীর ছন্দ এবং তালের রূপক।ঢাকের শব্দ ছন্দ এবং তালের সমার্থক।
এখানে মনে হতে পারে, তালবাদ্য থেকে কি বর্ণের সৃষ্টি হওয়া কি সম্ভব? বলে রাখা ভাল প্রতিটি তালবাদ্যের বোল অথবা বাণী বিভিন্ন বর্ণের সাহায্যেই তৈরী হয়েছে।
তবলার বোল ‍‌ : ‘ধিন ধাগে তেরে কেটে’, পাখোয়াজের বোল: ‘তেটে কতা গদি ঘেনে’, ঢোলের বোল: ‘টাক ডুমা ডুম্ ডুম্’ , খোলের বোল: ‘ঝাগুড় ঝাগুড় ঝিনি ঝিনি ঝিনি’, ইত্যাদি সব কিছুই বিভিন্ন বর্ণের সমাহার। তালবাদ্যের বোল অথবা বাণীর মাধ্যমে সমস্ত বর্ণকে প্রকাশ করা যায়।
এবার, নৃত্যের ভঙ্গীতে শিব ১৪ বার ঢক্কা বা ঢাক বাজানর পর এক একটি নতুন শব্দের সৃষ্টি হলো। প্রতিটি শব্দ বিভিন্ন বর্ণের সমষ্টি। শব্দগুলো হল:-
১) অ ই উ ণ্ ২) ঋ ৯ ক্ ৩) এ ও ঙ্ ৪) ঐ ঔ চ্ ৫) হ য ৱ র ট্ ৬) ল ণ্ ৭) ঞ্ ম ঙ্ ণ ন ম্ ৮) ঝ ভ ঞ ৯) ঘ ঢ ধ ষ্ ১০) জ ব গ ড দ শ্ ১১) খ র্ফ ছ ঠ থ চ ট ত ৱ্ ১২) ক প য্ ১৩) শ ষ স র্ ১৪) হ ল্ ।

বলা হয়, শিবের উপদেশে, পাণিনি এই শব্দগুলিকে ১৪ টি সূত্র হিসেবে গ্রহণ করলেন।
এই ১৪ টি সূত্র শিবসূত্রজাল অথবা মাহেশ্বর সূত্র । এই সূত্রগুলি পাণিনির ব্যাকরণের চাবিকাঠি। এই শিবসূত্রজালের জন্য পাণিনি বিখ্যাত, এবং তাই তিনি অন্যান্য বৈয়াকরণদের থেকে একেবারে আলাদা।
শিবসূত্রের প্রত্যেকটির নাম সংজ্ঞা।সেজন্য, এটির আর ১ টি নাম সংজ্ঞাসূত্র। মনে রাখার সুবিধার জন্য পাণিনি এগুলোকে আরো সংক্ষিপ্ত করলেন। নাম দিলেন:- প্রত্যাহার সূত্র। প্রত্যাহার মানে সংক্ষেপিত।
এক বা একাধিক সূত্রের প্রথম ও শেষ বর্ণটি জোড়া দিয়ে যে শব্দটি তৈরী হয় তাকে প্রত্যাহার বলে। যেমন ‘অণ্’ একটি প্রত্যাহার,যার অর্থ অইউ । অক্ একটি প্রত্যাহার যার অর্থ অইউঋ৯।
চলবে……………………..

Wednesday, December 31, 2008

সাহিত্যের ছোট কাগজ প্রাণস্রোত বইমেলায় বের হচ্ছে

সাহিত্যের ছোট কাগজ প্রাণস্রোত বইমেলায় বের হচ্ছে-

ছয় বছর পর আবার প্রকাশিত হচ্ছে সাহিত্যের ছোট কাগজ প্রাণস্রোত। এবারের প্রধান বিষয় বুদ্ধদেব বসু জন্মশতবার্ষিকী। প্রবীণ ও তরুণদের বুদ্ধদেব মূল্যায়ন প্রকাশিত হবে। থাকছে শুন্য দশকের পাঁচজন কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলাচনা। এবং কবিতা।

Sunday, December 28, 2008

সন্তোষ রায়ের কবিতা

সন্তোষ রায়ের কবিতা
জমিন

অনুরোধ করি না কাউকে; দেবতাকেও না।
বলি না, একখণ্ড মাটি দাও।
বাবা ছিলেন মাটির মানুষ, তারই
দান আমি।

শুতে গেলে মনে হয়- একখণ্ড জমিন পড়ে আছি-
দু'দিকে বিবদমান মানুষ, মাঝখানে আমি আলবাঁধা।

কাদা নিয়ে উঠে আসি।
আমি কি খাই? আমার কোন শেকড় নাই।
ব্যথা কি পাই? আমার কোন তন্ত্র নাই,
মন্ত্র নাই।

মা, তুলসীতলার প্রদীপ।
দেখেন, বোঝেন সব।
চোখ বুজে কা'র জন্যে অনুরোধ করেন, আমি জানি না।

আমি অনুরোধ করি না কাউকে
দেবতাকেও না।

Thursday, December 25, 2008

সুবোধ ঘোষের প্রবন্ধ


সুবোধ ঘোষের প্রবন্ধ
নতুন ক'রে পাব বলে


আদিযুগ আর নবতম যুগ, রূপের দিক দিয়ে এই দূয়ের মধ্যে ভিন্নতা আছে, কিন্তু এই ভিন্নতা নিশ্চই বিচ্ছেদ নয়। নবতমের মধ্যে হোক, আর পুরাতনের মধ্যে হোক, শিল্পীর মন সেই এক চিরন্তনেরই রূপের পরিচয় অন্বেষণ ক'রে থাকে।শিল্পীর সাধনা হলো নতুন ক'রে পাওয়ার সাধনা। শুধু পথ চাওয়াতেই আর চলাতেই শিল্পীর আনন্দ নয়, নতুন ক'রে পাওয়ার আনন্দও শিল্পীর আনন্দ। আদিযুগের রূপকে এই জগতে আর একবার পাওয়া যাবে না ঠিকই, কিন্তু আদিযুগের রূপকে নতুন ক'রে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শিল্পী ছাড়তে পারেন না। কারণ, সেই পুরাতনের রূপের সঙ্গে একটি অখণ্ড আত্মীয়তার ডোরে বাঁধা রয়েছে নবতম যুগের মানুষেরও জীবনের রূপ।
জীবনের রূপ সম্বন্ধে এই অখণ্ডতার বোধ হলো কবি শিল্পী ও সাধকের মহানুভূতি এবং এই মহানুভূতিই মানুষজাতির শিল্পে ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেখানে সবচেয়ে কেশি স্পষ্ট ও সুন্দর আত্মপ্রকাশ লাভ করেছে সেখানেই আমরা পেয়েছি ক্লাসিক গৌরবে মণ্ডিত সাহিত্য ও শিল্প। ক্লাসিক-এর রূপ ও ভাব খণ্ডকালের মধ্যে সীমিত নয়। কালোত্তর প্রেরণার শক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে আছে কবি বাল্মীকির রামায়ণ এবং ব্যাসদেবের মহাভারত। বিশেষ কোন জাতির জীবনের রীতিনীতি ও ঘটনা অথবা বিশেষ কোন যুগের ইতিহাসের উত্থান-পতনের ঘটনাকে আশ্রয় করে রচিত হলেও বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্যকীর্তিগুলির মধ্যে মানবজীবনের চিরকালীন আনন্দ হর্ষ ও বেদনার ব্যাকুলতা বাঙ্ময় হয়ে রয়েছে। ভোরের সূর্যের মত এই মহাপ্রাণময় কাব্য ও শিল্পরীতিগুলি মানুষের মনের আকাশে নিত্য নতুন আলোকের প্রসন্নতা ছড়ায়। তাই প্রতি জাতির সাহিত্যে দেখা যায় যে, নতুন কবি ও শিল্পীরা জাতির অতীতের রচিত মহাকাব্য গাথা সঙ্গীত ও শিল্পরীতি থেকে প্রেরণা আহরণ করেছেন।
কিন্তু ক্লাসিকের রূপ ও ভাবের ভাণ্ডার থেকে আহৃত উপাদান দিয়ে রচিত এই নতুন সৃষ্টিগুলি সম্পূর্ণভাবে আধুনিকতম নতুন সৃষ্টিরূপে পরিণতি লাভ করে, পুরাতনের পুনরাবৃত্তি হয় না। ইওরোপীয় সাহিত্য ও শিল্পে বিভিন্ন কয়েকটি রেনেসাঁর ইতিহাস লক্ষ্য করলেও এই বিস্ময়কর নিয়মের সত্যতা আবিষ্কৃত হয় যে, আধুনিক কবি ও শিল্পীর হৃদয় পুরাতনেরই মহাপ্রাণময় কাব্য ও শিল্পের রূপগরিমার সাযুজ্য লাভ করে বিপুল নতুনত্ব সৃষ্টির অধিকার লাভ করেছিল। এই সাফল্যের অন্তনির্হিত রহস্য বোধ হয় এই যে, ক্লসিকের অনুশীলনে কবি ও শিল্পী সহজেই সেই দৃষ্টিসিদ্ধি লাভ করে থাকেন, যার ফলে জীবনের রূপকে যুগ হতে যুগান্তরের প্রবাহিত এক অক্ষান্ত ও অখণ্ড রূপের ধারা বলে সহজে উপলদ্ধি করা যায়।
বিশ্বের ক্লাসিক সাহিত্য এই উপলদ্ধির বাণীময় রূপ। তাই ক্লাসিক-এর অনুশীলন সহজে মানুষের চিত্তের ভাবনাকে প্রকৃত রূপসৃষ্টির রীতিনীতি ও পথ চিনিয়ে দেয়। এক কথায় বলতে পারা যায়, ক্লাসিক সাহিত্য ও শিল্পরীতির সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়া জীবনের রূপকে নতুন করে নিকটে পাওয়ার উপায়।
মহাভারতের মূলকাহিনী ছাড়া আরও এমন শত শত উপাখ্যানে এই গ্রন্থ আকীর্ণ যার মূল্য সহস্র বৎসরের প্রাচীনতার প্রকোপেও মিথ্যা হয়ে যায়নি। কারণ, ব্যক্তির ও সমাজের মন এবং সম্পর্কের যে-সব সমস্যা মহাভারতীয় উপাখ্যানগুলির মূল বিষয়, সে-সব সমস্যা বিংশ শতাব্দীর নরনারীর জীবন থেকেও অন্তর্হিত হয়নি। নরনারীর প্রণয় ও অনুরাগ, দাম্পত্যের বন্ধন বাৎসল্য ও সখ্য- শ্রদ্ধা ভক্তি ক্ষমা ও আত্মত্যাগ ইত্যাদি যে-সব সংস্কারের উপর সামাজিক কল্যাণ ও সৌষ্ঠব মূলত নির্ভর করে, তার এক-একটি আদর্শৌচিত ব্যাখ্যা এইসব উপাখ্যানের নায়ক-নায়িকার জীবনের সমস্যার ভিতর দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। শত শত ব্যাক্তি ও ব্যাক্তিত্বের যে-সব কাহিনী মহাভারতে বিবৃত হয়েছে তার মধ্যে এই বিংশ শতাব্দীর যে-কোন মানুষ তাঁর নিজের জীবনেরও সমস্যার অথবা আগ্রহের রূপ দেখতে পাবেন। এই কারণে শতেক যুগের কবিদল মহাভারত থেকে তাদেঁর রচনার আখ্যানবস্তু আহরণ করেছেন।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্লাসিক সাহিত্যের তুলনায় ভারতের ক্লাসিক এই মহাভারত কিন্তু একটি বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। এই মহাভারতই বস্তুত ভারতের সাধারণ লোকসাহিত্যে পরিণত হয়েছে।ভারতের কোট কোটি নিরক্ষরের মনও মহাভারতীয় কাহিনীর রসে লালিত। ভারতীয় চিত্রকরের কাছে মহাভারত হলো রূপের আকাশপট, ভাস্করের কাছে মূর্তির ভাণ্ডার। গ্রাম-ভারতের কথক ভাট চারণ ও অভিনেতা, সকল শ্রেণীর শিল্পী মহাভারতীয় কাহিনীকে তার নাটকে সংগীতে ও ছড়ায় প্রাণবান করে রেখেছে। মহাভারতের কাহিনী এবং কাহিনীর নায়ক-নায়িকার চরিত্র ও রূপ ভারতীয় ভাস্কর স্থপতি চিত্রকার নট নর্তক ও গীতিকারের কাছে তার শিল্পসৃষ্টির শত উপাদান, ভাব, রস, ভঙ্গী, কারুমিতি ও অলংকারের যোগান দিয়েছে। মহাভারত গ্রন্থ প্রতিশব্দ উপমা ও পরিভাষার অভিধান। ভারতের জ্যোতির্বিদ মহাভরতীয় নায়ক-নায়িকার নাম দিয়ে তাঁর আবিষ্কৃত ও পরিচিত গ্রহ-নক্ষত্র-উপগ্রহের নামকরণ করেছেন। আকাশলোকের ঐ কালপুরুষ অরুন্ধতী রোহিনী চন্দ্র বুধ ও কৃত্তিকা, কতগুলি জ্যোতিষ্কের নাম মাত্র নয়- এরা সকলেই এক-একটি কাহিনীর, এক-একটি প্রীতি ভক্তি ও রোমান্সের নায়ক-নায়িকা। গঙ্গা নর্মদা যমুনা ও কৃষ্ণবেনা- কতগুলি নদীর নাম মাত্র নয়, ওরাও কাহিনী। ভারতের বট অশোক শাল্মলী করবী ও কর্ণিকার উদ্ভিদ্ মাত্র নয়, তারাও সবাই এক-একটি কাহিনীর নায়ক ও নায়িকা। নৈসর্গিক রহস্য ও মেরুজ্যোতির অভ্যন্তরে কাহিনী আছে, সামুদ্র বাড়বানলের অন্তরালে কাহিনী আছে, সপ্তাশ্বযোজিত রথে আসীন সূর্যের উদয়াচল থেকে শুরু করে অস্তাচল পর্যন্ত অভিযানের সঙ্গে সঙ্গে কাহিনী আছে। মহাভারতীয় কাহিনীর নায়ক-নায়িকার নাম হলো ভারতের শত শত গিরি পর্বত নদ নদী ও হ্রদের নাম। ভারতীয় শিশুর নামপরিচয়ও মহাভারতীয় চরিত্রগুলির নামে নিষ্পন্ন হয়।

(ভারত প্রেমকথা/ মুখবন্ধ, ১৪০২ বঙ্গাব্দ)

তুষার গায়েনের কবিতা

তুষার গায়েনের কবিতা
যে রূপ আমি শুনিলাম কানে

মালিনী মাসির হাসি, নিলাজ গুঞ্জন তুলে আনে
আনন্দিত শিহরণ এই ভীত মনে- সরোবরে
ছায়া প’ড়ে আছে তার এ অমোচনীয় আঠার প্রলেপ
বায়ুযোগে ঢেউ উঠে গোল হয়ে, সরে যায় দূর
গোলাকার তলে- তবু রূপ তার হাসিতে অনড়
বেড়ালের মত এই অপরাহ্ণ বেলা!

নিবিড় নৈঃশব্দ চারিদিকে, ফুল ফোটাবার যত
আয়োজন গাঢ় প্ররোচনা করে যায় ঝিঝিদেঁর
দল, জোনাকিও জোটে এসে- জ্বলে নেভে ঈর্ষাতুর
দূর তারাদের দেখে। যে গেছে চন্দনবনে-

মাসি! তাঁর চোখ তুমি বেঁধে রাখো কেন?
সুরভি কি ঢেকে যায় বলো, আঁচলের তলে?
সখির কাঞ্চনরূপ কালির কলঙ্কে বুঝি মোছে!
হয়েছে, হয়েছে মাসি, তাঁকে দূর থেকে ভালবাসি
দেখি নাই যাকে কোনদিন, তবু তার রূপের কীর্তন
তাঁর, আমি শুনেছি তো কানে!

মাসুদ খানের কবিতা

মাসুদ খানের কবিতা
সোনার খনির খুব কাছে

সোনার খনির খুব কাছে গিয়ে বসে থাকে রোজ
স্বর্ণজরে ভোগা রোগামতো একটি মানুষ।
পাশেই জলধি এক, অথই অপার।
শামুকে শ্যাওলায় মাখামাখি
আশ্চর্য সোনালী এক শৈবালিনী জেগে ওঠে যদি,
আকার ও অলংকারসহ,
কোনো এক মৎসগন্ধা সন্ধ্যাবেলায়-

সেই লোভে লোকটা এসে বসে থাকে মোহ-লাগা সারাটা দিবস...

(*সরাইখানা ও হারানো মানুষ,২০০৬)